নিজস্ব প্রতিনিধি :হাঁটুর ব্যথায় যখন কাতর তখন যে কোন মুহূর্তেই তার ভয়ংকর ধারণ করতে পারে। ডাঃ রাজীব রমন,( কনসালট্যান্ট, আর্থ্রোস্কোপি ও স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, joint and bone care hospital সল্টলেক, ও মনিপাল ব্রডওয়ে, সল্টলেক কলকাতা) হাঁটু চিকিৎসায় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আধুনিক চিকিৎসার প্রয়োগে সমাধান করার চেষ্টা করেছেন।
হাঁটুর ব্যথা অনেক সময় আমরা সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাই। কিন্তু খেলাধুলা, ব্যায়াম, হঠাৎ পা ঘুরে যাওয়া বা দৈনন্দিন কাজের সময় হাঁটুতে চোট লাগার পর ব্যথা হলে তার কারণ মেনিস্কাসে চোটও হতে পারে। সময়মতো সমস্যা শনাক্ত করা গেলে হাঁটুকে সুরক্ষিত রাখা এবং ভবিষ্যতে আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
মেনিস্কাস হলো হাঁটুর ভেতরে থাকা *C-আকৃতির নরম কার্টিলেজ* । এটি হাঁটুর ওপর শরীরের ওজন সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে, হাঁটুকে স্থির রাখতে এবং জয়েন্টের কার্টিলেজকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই মেনিস্কাস হাঁটুর অপ্রয়োজনীয় কোনো অংশ নয়।
*মেনিস্কাসে চোটের কারণ*
কমবয়সী ও সক্রিয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে খেলাধুলার সময় হাঁটু হঠাৎ ঘুরে গেলে, দিক পরিবর্তন করলে বা শরীরের ভার একদিকে চলে গেলে মেনিস্কাসে চোট লাগতে পারে। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, বাস্কেটবল-সহ যেসব খেলায় বারবার দিক পরিবর্তন করতে হয়, সেগুলিতে মেনিস্কাসে চোটের ঝুঁকি বেশি।
অন্যদিকে, মধ্যবয়স্ক ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে মেনিস্কাস দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে কখনও কখনও সামান্য নড়াচড়া বা সাধারণ কাজের সময়ও মেনিস্কাসে ক্ষত বা ছিঁড়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
*কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না?*
মেনিস্কাসে চোট লাগলে হাঁটুর ভেতর বা বাইরের দিকে ব্যথা হতে পারে। কাজ বা ব্যায়ামের পর হাঁটু ফুলে যেতে পারে। অনেকের হাঁটুতে শব্দ হওয়া, আটকে যাওয়া বা লক হয়ে যাওয়ার সমস্যাও দেখা যায়। হাঁটু পুরোপুরি ভাঁজ বা সোজা করতে সমস্যা হতে পারে। বসার সময়, সিঁড়ি ওঠার সময় বা হাঁটু ঘোরালে ব্যথা বাড়তে পারে। কখনও কখনও মনে হতে পারে, হাঁটু হঠাৎ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে বা ভেঙে পড়তে পারে।
বিশেষ করে হাঁটু লক হয়ে গেলে এবং পুরোপুরি সোজা করা না গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
*মেনিস্কাস সংরক্ষণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?*
মেনিস্কাস হাঁটুর জয়েন্টের ওপর চাপ কমাতে এবং শরীরের ওজন সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। তাই আধুনিক চিকিৎসায় যেখানে সম্ভব, মেনিস্কাস সংরক্ষণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
*মেনিস্কাস বাঁচান — হাঁটু বাঁচান।*
মেনিস্কাসের একটি বড় অংশ কেটে বাদ দিলে হাঁটুর জয়েন্টের কার্টিলেজের ওপর চাপ বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই উপযুক্ত ক্ষেত্রে মেনিস্কাস সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনে তা মেরামত করার চেষ্টা করা হয়।
*সব মেনিস্কাসের চোটে কি অস্ত্রোপচার দরকার?*
মেনিস্কাসে চোট লাগলেই যে অস্ত্রোপচার করতে হবে, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে কাজকর্মে কিছুটা পরিবর্তন, ফিজিওথেরাপি, হাঁটুর পেশি শক্ত করার ব্যায়াম এবং উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
তবে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের চোটে অস্ত্রোপচার উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে কমবয়সী বা সক্রিয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে মেরামত করা সম্ভব এমন চোট, হাঁটু লক করে দেওয়া ধরনের চোট এবং লিগামেন্টের চোটের সঙ্গে থাকা কিছু মেনিস্কাসের চোটে আর্থ্রোস্কোপিক মেনিস্কাস রিপেয়ার করা হতে পারে।
চিকিৎসার পদ্ধতি প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে আলাদা হওয়া উচিত। রোগীর বয়স, শারীরিক সক্রিয়তা, উপসর্গ, মেনিস্কাসে চোটের ধরন ও অবস্থান এবং হাঁটুর অন্য কোনো চোট রয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসা ঠিক করা হয়।
*সঠিক চিকিৎসায় খেলাধুলায় ফেরা সম্ভব*
সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং নিয়ম মেনে রিহ্যাবিলিটেশন করলে অনেক রোগীই আবার খেলাধুলা ও স্বাভাবিক সক্রিয় জীবনে ফিরতে পারেন।
তাই চোট লাগার পর হাঁটুর ব্যথা, ফোলা, আটকে যাওয়া বা লক হয়ে যাওয়ার সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
মেনিস্কাসকে সুরক্ষিত রাখুন, হাঁটুর জয়েন্টকে ভালো রাখুন এবং সক্রিয় থাকুন।
*জনসচেতনতার বার্তা*
হাঁটু ঘুরে যাওয়ার মতো চোটের পর ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে সঠিকভাবে পরীক্ষা করানো জরুরি। মেনিস্কাসে গুরুতর চোট দ্রুত শনাক্ত করা গেলে তা সংরক্ষণ করার এবং দীর্ঘমেয়াদে হাঁটুর স্বাস্থ্য ভালো রাখার সুযোগ বাড়ে।
আর ডাক্তারবাবুর প্রকৃত চিকিৎসা এবং তার উপদেশ যদি মেনে চলা যায় তবে এই ধরনের রোগ থেকে অনেক আগেই বাঁচা সম্ভব হবে।

