বিশ্ব নদী দিবস: কলকাতার রিভারফ্রন্ট ও বেনারস-শৈলীর ঘাটের জন্য ‘ইডেন রিয়েলটি’-র বিশেষ পরিকল্পনা উন্মোচন

শালিমারে ‘ইডেন রিয়েলটি’-র ১৫০ কোটি টাকার রিভারফ্রন্ট বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায়, হাওড়া রিভারফ্রন্ট বা নদীতীরে বেনারস-শৈলীর গঙ্গা-ঘাটের জন্য কাঠামোগত নকশা ও উন্নয়নের রূপরেখা প্রকাশ করা হলো।

কলকাতা, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নদী দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে, হুগলি নদীর তীরে নগর-পুনরুজ্জীবন এবং ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটতে চলেছে। ‘ইডেন রিয়েলটি গ্রুপ’ তাদের একটি স্বপ্নের প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দিতে চলেছে; তারা আনুষ্ঠানিকভাবে হাওড়া রিভারফ্রন্টে বেনারস-শৈলীর গঙ্গা-ঘাটের কাঠামোগত নকশা ও উন্নয়নের রূপরেখা প্রকাশ করেছে। ‘ইডেন দেবপ্রয়াগ’-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই রিভারফ্রন্ট উন্নয়ন প্রকল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে এই ঘাটগুলি।
গঙ্গার ভাবধারা ও মাহাত্ম্যকে ধারণ করে বেসরকারি উদ্যোগ কীভাবে কাজ করতে পারে, এই প্রকল্পটি তার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। এর লক্ষ্য হলো কলকাতা ও হাওড়া—এই যমজ শহরে বিলাসবহুল জীবনযাপন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং নগর-পরিবেশ বা বাস্তুতন্ত্রের ধারণাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা।
যে নদী গড়ে তুলেছে এক শহর
১৬৯০ সালে হুগলি নদীর তীরে গড়ে ওঠা বসতি থেকেই কলকাতার বিস্তার শুরু হয়েছিল; তখন থেকেই এই নদী শহরের বাণিজ্য, বিশ্বাস ও পরিচিতি গড়ে তুলেছে। গঙ্গার একটি শাখা বা উপনদী হিসেবে হুগলি প্রায় ২,৫২৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এবং এর অববাহিকা জুড়ে ৪০ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনধারণে সহায়তা করে। হাওড়া তীরের জন্যও এই নদী সমানভাবে জীবনরেখা স্বরূপ; এখানেই অবস্থিত আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেন (১৭৮৭) এবং আইআইইএসটি (IIEST) শিবপুর। অথচ বাবুঘাট বা প্রিন্সেপ ঘাটের মতো ঐতিহাসিক ঘাটগুলি আজও প্রাণবন্ত জনসমাগমস্থল হিসেবে টিকে থাকলেও, পশ্চিম তীরের রিভারফ্রন্টের বড় একটি অংশ এখনও অব্যবহৃত এবং স্থানীয় জনবসতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে।
হুগলির তীরে বেনারসের আবহ
বারাণসীর বিখ্যাত ঘাটগুলি—যেখানে ৮০টিরও বেশি পাথরের সিঁড়ি গঙ্গার জলধারা পর্যন্ত নেমে গেছে—বিশ্বের অন্যতম পরিচিত রিভারফ্রন্ট বা নদীতীরবর্তী জনসমাগমস্থল। এগুলি একইসাথে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, বিনোদন এবং সামাজিক মেলবন্ধনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে। ইডেন রিয়েলটির তৈরি ঘাটগুলো আধুনিক হাওড়ার প্রেক্ষাপটে সেই ঐতিহ্যকে নতুন রূপে তুলে ধরেছে।
পরিকল্পনাটির মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
ধাপযুক্ত নদীর ঘাট: শিবপুরের লোয়ার ফোরশোর রোড বরাবর ১০০ মিটার দীর্ঘ সুদৃশ্য ও ধাপযুক্ত নদীর ঘাট।
আনুষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো: ধাপযুক্ত ঘাটের সংলগ্ন একটি নির্দিষ্ট ‘গঙ্গা আরতি’ অঞ্চল এবং সেই সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও সামাজিক সমাবেশের জন্য একটি বড় আকারের ব্যাঙ্কোয়েট বা অনুষ্ঠান-কক্ষ। ব্যাঙ্কোয়েটের ছাদটি একটি উন্মুক্ত চত্বর (টেরেস) হিসেবে পরিকল্পিত, যেখানে গঙ্গা-দর্শন সুবিধাসহ একটি সুইমিং পুল এবং তার পাশেই পার্টির জন্য একটি লন বা খোলা জায়গা থাকবে।
সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এলাকা ও আলোকসজ্জা: নদীর ধার ঘেঁষে জনসাধারণের হাঁটার জন্য একটি নিরবচ্ছিন্ন পথ (প্রমেনেড) এবং ঐতিহ্য-ভিত্তিক স্থাপত্যশৈলী-সম্মত আলোকসজ্জা। এই আলোকসজ্জা রাতের বেলা ঘাটের গঠনশৈলীকে ফুটিয়ে তুলবে এবং সান্ধ্যকালীন আরতি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে।
নদীর তীর রক্ষা ও পরিবেশগত ভারসাম্য: ঘাটের কাঠামোগত নকশাটি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি তীর-রক্ষা পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। হুগলি নদীর জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত অংশে—যেখানে প্রতিদিন জলের স্তরের পরিবর্তন ও ঋতুভেদে জলের প্রবল প্রবাহ দেখা যায়—সেখানে তীরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পেয়েছে। নদীর তীর বরাবর পর্যাপ্ত দেশীয় গাছপালার বেষ্টনী (গ্রিন বাফার) মাটিকে ধরে রাখতে, বৃষ্টির জল বা উপরিভাগের জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং নদীর তীরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়তা করবে।
জল ব্যবস্থাপনা: ‘জিরো-লিকুইড-ডিসচার্জ’ (ZLD) বা বর্জ্য-জল-নির্গমন-শূন্য কাঠামো, যার আওতায় উৎপন্ন সমস্ত বর্জ্য জল শোধন করে সেই স্থানেই পান-অযোগ্য কাজে পুনরায় ব্যবহার করা হবে। নদীতে কোনো বর্জ্য জল ফেলা হবে না, ফলে নদীর জলের গুণমান অক্ষুণ্ণ থাকবে।
বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন
এই ঘাট নির্মাণে ২০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং এটি ১৫০ কোটি টাকার সামগ্রিক নদী-তীর উন্নয়ন প্রকল্পের একটি অংশ, যার মধ্যে নদীর ধারে একটি ৫-তারকা হোটেলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ‘সি-আর্চ’ (Se-arch)-এর স্থপতি কপিল ভাল্লার নকশায় তৈরি এই ঘাটটি আগামী ‘গঙ্গা দশেরা’র (যে উৎসবে পৃথিবীতে গঙ্গার আগমন উদযাপন করা হয়) আগেই সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি পোর্ট, কলকাতা (SMPK)-এর সহযোগিতা ও সমর্থনে বাস্তবায়িত হচ্ছে; উল্লেখ্য, শহরের নদী-তীরের একটি বড় অংশের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে এই সংস্থাটি।
কেন্দ্রবিন্দুতে ‘ইডেন দেবপ্রয়াগ’
নদীর তীরের এই এলাকার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ইডেন দেবপ্রয়াগ’—শালিমারের লোয়ার ফোরশোর রোডে অবস্থিত এই গ্রুপের প্রধান বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প (টাউনশিপ)। ৯ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রকল্পে রয়েছে পাঁচটি টাওয়ার (প্রতিটি বেসমেন্ট ও নিচতলাসহ ২৮ তলা বিশিষ্ট), যেখানে সিমপ্লেক্স ও ডুপ্লেক্স ধরনের আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে।
‘দেবপ্রয়াগ’ প্রকল্পটি শালিমার রোডে অবস্থিত ৩৮ একর আয়তনের বৃহত্তর ‘কলকাতা ওয়েস্টশোর’ (Kolkata Westshore) পরিকল্পনার একটি অংশ; এই উদ্যোগটি হাওড়ার নদী-তীরবর্তী এলাকাকে শহরের পরবর্তী অভিজাত ও আকর্ষণীয় ঠিকানা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের এক আদর্শ উদাহরণ
এখানে নির্মিত ঘাটগুলো ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ‘নমামি গঙ্গে’ কর্মসূচির আওতায় নদী পুনরুদ্ধারের জাতীয় প্রচেষ্টার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রকল্পটি একটি যৌথ উদ্যোগের মডেল তুলে ধরে, যেখানে একটি বেসরকারি নির্মাণ সংস্থা বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নদীর তীরের অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন ও নকশা প্রণয়ন করে এবং তা বাস্তবায়ন করে; পাশাপাশি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক পরামর্শ এর প্রকৌশলগত দিকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয়। এর ফলে এমন এক নাগরিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে যা সকল নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত।
‘ইডেন রিয়েলটি’-র কর্মপদ্ধতি একটি সাধারণ বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত: নদীর তীর কোনো ব্যক্তিগত উপভোগের বিষয় নয়, বরং এটি সকলের যৌথ সম্পদ। এখানে বিলাসবহুল আবাসন, আতিথেয়তা-কেন্দ্রিক স্থাপনা এবং সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী ঘাটগুলোকে একটি নিরবচ্ছিন্ন ভূ-দৃশ্য বা ল্যান্ডস্কেপের অংশ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে স্থানীয় বাসিন্দা, তীর্থযাত্রী, পরিবার-পরিজন এবং দর্শনার্থীরা নদীর তীরে একে অপরের সান্নিধ্য লাভ করতে পারেন।
“গঙ্গা নদীই এই শহরকে প্রাণ দিয়েছে। বিশ্ব নদী দিবসে আমরা…” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *