রাভাশ ২০২৬ — ভক্তি, ঐতিহ্য ও নৃত্যসাধনার এক অনন্য মহোৎসব

৫ই আগস্ট, ২০২৬ কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র সদন যেন সেদিন পরিণত হয়েছিল ভক্তি, সৌন্দর্য ও শাস্ত্রীয় নৃত্যের এক পুণ্যভূমিতে। সংকল্প নৃত্যায়ন, ওডিশি নৃত্যচর্চার এক নিবেদিতপ্রাণ প্রতিষ্ঠান, তাদের ২৩তম বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ‘রাভাশ ২০২৬’-এর মাধ্যমে এক অবিস্মরণীয় সন্ধ্যার আয়োজন করে। এবারের অনুষ্ঠানটি ছিল আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি উৎসর্গিত ছিল পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের উদ্দেশ্যে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যে তাঁর অমর উত্তরাধিকার, অনন্য শিল্পদৃষ্টি এবং অতুলনীয় অবদানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ ও উদযাপন করা হয় এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
যাঁর শিল্পদৃষ্টি, সাধনা ও অনন্য সৃষ্টিশীলতা ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যকে বিশ্বদরবারে এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ভগবান জগন্নাথদেবের আরাধনার মাধ্যমে। এরপর প্রতিষ্ঠান-নির্দেশক শ্রী সুবিকাশ মুখার্জি সকলকে আন্তরিক স্বাগত জানান। শুভ সূচনার প্রতীক মঙ্গলাচরণ পরিবেশনার প্রতিটি ভঙ্গিমা যেন ভক্তিভাবের এক নিবেদিত অর্ঘ্যে পরিণত হয়।

সন্ধ্যাটি আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে বিশিষ্ট ওডিশি নৃত্যশিল্পী রাজশ্রী প্রহরাজ (সংগীত নাটক আকাদেমি ‘বিসমিল্লা খান’ পুরস্কারপ্রাপ্ত) এবং প্রীতিশা মহাপাত্র (পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের দৌহিত্রী)-এর সান্নিধ্যে। তাঁরা উভয়েই গুরু রতিকান্ত মহাপাত্রের শিষ্যা। গুরু রতিকান্ত মহাপাত্রের নির্দেশনায় তাঁদের মনোমুগ্ধকর ‘অর্ধনারীশ্বর’ পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে এবং গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের চিরন্তন শিল্পঐতিহ্যের প্রতি এক যথার্থ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত ছিল দুটি স্মারক বৃত্তি প্রদান, যা প্রিয়জনের স্মৃতিকে ভবিষ্যতের আশা ও অনুপ্রেরণায় রূপান্তরিত করেছে। ‘জিতবৃত্তি’ (শুভদীপ চক্রবর্তী স্মারক বৃত্তি) প্রদান করা হয় ঋষিতা দাস-কে এবং ‘উদ্ভাস’ (প্রলয় দাশগুপ্ত স্মারক বৃত্তি) প্রদান করা হয় মৃত্তিকা সেন-কে। এই দুই বৃত্তির মাধ্যমে নবীন নৃত্যশিল্পীদের নিষ্ঠা, বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে উৎকর্ষ সাধনের পথে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়।

সারা সন্ধ্যা জুড়ে মঞ্চ আলোকিত হয়ে ওঠে একাধিক মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায়। এর মধ্যে ছিল ‘বসন্ত পল্লবী’, ‘কাহি গোলে’ (অভিনয়), ‘মোহনা পল্লবী’, ‘সাবেরী পল্লবী’, ‘শ্রিতা কমলা’ (অষ্টপদী) এবং প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ শিষ্যাদের পরিবেশনায় ‘মলিমলো’। এছাড়াও, প্রতিষ্ঠান-নির্দেশক শ্রী সুবিকাশ মুখার্জি-র একক পরিবেশনা ‘রসে হরি মিহা’ (অষ্টপদী) দর্শকমনে গভীর আবেগের সঞ্চার করে।

অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে গুরু অসীমবন্ধু ভট্টাচার্য এবং উপাসনা সেন্টার ফর ড্যান্স (কথক )-এর পরিবেশনায় ‘নিবেদনম্’-এর মাধ্যমে, যা ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত ঐক্য, সম্প্রীতি ও সৌন্দর্যকে অনবদ্যভাবে তুলে ধরে।

সুদক্ষ সঞ্চালক রোহন সেনগুপ্ত-র সাবলীল উপস্থাপনায় সমগ্র অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সংকল্প নৃত্যায়নের ছাত্রছাত্রীদের নিষ্ঠা, সাধনা ও শিল্পসত্তার অনন্য প্রকাশে ‘রাভাশ ২০২৬’ হয়ে ওঠে ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের এক অপূর্ব উদযাপন।

‘রাভাশ ২০২৬’ কেবল একটি বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল এক গভীর আবেগময় যাত্রা, যেখানে ভক্তি ও সাধনা একসূত্রে মিলিত হয়েছে, ঐতিহ্য ভবিষ্যৎকে আলিঙ্গন করেছে, এবং প্রতিটি তাল-লয়ে প্রতিধ্বনিত হয়েছে চিরন্তন গুরু-শিষ্য পরম্পরার মহিমা। মঞ্চে পর্দা নামার সাথে সাথে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটলেও, উপস্থিত সকলের হৃদয়ে রয়ে যায় কৃতজ্ঞতা, অনুপ্রেরণা এবং ভারতের অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে সংরক্ষণ ও উদযাপনের এক নব অঙ্গীকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *